১. কোন একটি কাজ শখের বশে অথবা শখ হিসেবে করা হচ্ছে, তার মানে এই নয় যে তা অবশ্যই অর্থহীন ও ইউজলেস হতে হবে। ব্যাপারটি কিন্তু বাস্তব। অর্থপূর্ণ ও ইউজফুল কোন কিছু করে মজা পেলেও তাকে আমরা আজকাল শখের কাজ সাব্যস্ত করতে চাইনা। তৃপ্ত ও সুখী হওয়ার পরেও মনে মনে অর্থহীন ও ইউজলেস কিছু খুঁজে বেড়াই। এই তাড়নার নেপথ্যে আছে বিভিন্ন কালচার ও লাইফস্টাইলের ন্যারেটিভ। সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে পারুক বা না পারুক, পরোক্ষভাবে ঠিকই তা আঘাত হানে আমাদের পারসোনায়।
এমনটি কিন্তু অবধারিত নয়। কয়েক দশক পেছনে চলে গেলেই ভিন্ন চিত্র দেখতে পাবেন- একজন সুস্থ মানুষ সাধারনত ডিগনিফাইড, ম্যাচিউরড, দায়িত্ববান, প্রজ্ঞাবান, ও সুস্থির। অতএব, আমাদের পক্ষে কেন নয় তেমনটি?
২. কাউকে যদি এমন কোন শখের কাজ করতে দেখেন যাতে ইসলামি উপাদান আছে, তবে আপনিও তা ট্রাই দিন- ভাল লেগে গেলে স্থিত হয়ে যান।
৩. আমরা উপার্জনের জন্য যা করি- তথা ডে জব- তা কিন্তু নিছক আধুনিক ফেনোমেনা না। সকল যুগেই জীবিকার জন্য মানুষকে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করতে হয়েছে। কীর্তিমানেরা তাদের সুকীর্তি গড়েন কিন্তু ডে জবের বাইরের সময়েই- তথা শখের বশে। আপনি যে কোন ড্রিম প্রফেশনের চিত্র মাথায় আনুন, দেখবেন তার অনেকটা জুড়েই রুটিন ওয়ার্ক। কেবল তার উপর ভর করে কীর্তি গড়া যায়না। কীর্তি গড়তে অবশ্যই দিনের অন্য সময়গুলোয় ইনভেস্টেড হওয়া চাই।
শেখ আকরাম নাদয়ি যে এত সংখ্যক উন্নত মানের বই লিখেছেন এবং এত এত টপ কোয়ালিটি ‘আলিম তৈরি করেছেন, তা কিন্তু তিনি অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজে গবেষকের চাকরির অংশ হিসেবে করেননি- করেছেন চাকরির বাইরের সময়ে। কবি আল মাহমুদ আজীবন চাকরি করে গেছেন সংবাদপত্রে- কাব্য-উপন্যাস রচনা করেছেন কিন্তু চাকরির বাইরের সময়েই।
৪. ইমপ্যাক্টফুল দ্বিনদার লোকদের হবি নকল করার চেষ্টা করুন। তবে ‘হবি-শপিং’- তথা নিজের ডিজায়ার মোতাবেক বিভিন্ন হবি ডিসকভার করে বেড়ানো- যেন না করি। যেমন- অমুক শেখ স্কুবা ডাইভিং করে, অমুক প্রিচার বাঞ্জি জামপ দেয়, অমুক স্কলার কমিক বই পড়ে- খুঁজে খুঁজে যদি এইগুলোর তালিকা তৈরি করে নকল করার চেষ্টা করি তবে তা কি ধরনের ফল বয়ে আনবে ভাববার বিষয়।
৫. নিজের যা যা ব্যবহার্য জিনিস আছে তার যত্ন নিন, তার সাথে সুসম্পর্কিত থাকুন। আমরা কি দেখিনি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবিরা তাদের মালাকানাধীন ও ব্যবহার্য বিভিন্ন জিনিসের নাম পর্যন্ত দিতেন? কেউ যদি মায়া না করে, তাহলে কি নাম দেয়?
৬. সবকিছুকে অটোমেটেড বা আউটসোর্সড করে না ফেলি যেন। এমনটি করে ফেললে নিজের করায়াত্বের মধ্যে থাকবে কেবল ভারী কাজগুলো। ফলে লাইট কিছু করার অ্যাপেটাইট থেকেই যাবে। সময়ের ব্যবধানে তা অনর্থক নানান হবিকে আমন্ত্রন জানিয়ে বসবে। আর অনর্থক হবির কি অভাব আছে কোন?
৭. যা কিছু নিবেন হবি হিসেবে, তা একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখুন। প্রক্রিয়াটি এমনভাবে কাজ করবে যে, সময়ের ব্যবধানে হবি উদ্দেশ্যপূর্ণ কিছুতে রূপান্তরিত হবে, অথবা বাতিল হয়ে যাবে। যেমন, কারো যদি স্পোর্টসের শখ থাকে তবে একটি পর্যায়ে তা যেন রূপ নেয় স্বাস্থ্য সুরক্ষার পদক্ষেপে, কারো যদি বইপড়ার শখ থাকে তবে একটি পর্যায়ে সে যেন নিজেই লেখে অথবা অন্য কোনভাবে জ্ঞান বিতরণ করে, কারো যদি রান্নাবান্নার শখ থাকে তবে একটি পর্যায়ে সে যেন তা বাণিজ্যিকীকরণ করে বা সোস্যাল ওয়েলফেয়ারমূলক কোন কাজ- হোক গরীবকে খাওয়ানো, হোক মুসাল্লিদের খাওয়ানো, হোক কমিউনিটিকে খাওয়ানো- সে স্কিল ব্যবহার করে। যদি এমন কিছু না হয় করা, তবে দিনের পর দিন খেলে, পড়ে, রেঁধে কি লাভ?
৮. হবি ইনোভেট করার চেষ্টা করুন। হবি বলে যে কিছু কিছু গদবাঁধা ফ্রেজ আছে; যা অনলাইনে খুঁজলে পাওয়া যাবে, কিংবা স্কুল জীবনে যা নিয়ে আমরা রচনা-প্যারাগ্রাফ লিখেছি, আমাদের হবি যে তার মধ্য থেকেই হতে হবে এমন তো কোন কথা নেই! অতএব নিজের হবি নিজের মত করেই তৈরি করুন। পরে তা অন্যদের সাথে শেয়ার করুন, ছোটদের শেখান। হয়ত তাতে কল্যান থাকবে!
হবি হিসেবে কত জন কত কিছু করে! কেমন হবে যদি আমরা হবি ব্যাপারটাকে এমনভাবে স্টিয়ার করলাম যে, কেউ হবি হিসেবে নিল সিরাহ অধ্যয়ন- সে সিরাহ’র পঞ্চাশটি বই পড়ে ফেলল, কেউ হবি হিসেবে নিল মিডিয়া ওয়ার্ক- সে নানান মাধ্যমে দ্বিনি কাজ করেই গেল, কেউ হবি হিসেবে নিল নানান প্রান্তের মুসলিমদের ব্যাপারে জানা- সে ভাষা-অঞ্চল নির্বিশেষে ব্রিজ বিল্ডিংয়ের কাজ করেই গেল…!
৯. যে হবি দ্বিন বান্ধব ও দ্বিনি কর্মপ্রচেষ্টায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে তা যদি কোনভাবে আপনাকে আকর্ষিত করে একবার তবে সে আকর্ষণ যাতে আরো প্রবলতর হয়ে ওঠে সে লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিয়ে ফেলুন। যেমন, যদি একটি বই পড়ে ভাল লাগে তবে আরো দশটি বই কিনে ফেলুন, কোন দ্বিনি কাজের তাগাদা পাওয়ার পর যদি দেখেন যে তা করতে পারছেন তবে নিজেই বলে দিন যে এই ধরনের কাজে যেন আবার ডাকা হয়, নিজেকে এমনভাবে মেলে রাখুন যে মানুষ কাজের কথা বলতে যেন সংকোচ বোধ না করে। এভাবে এক্সপেন্স, কমিটমেন্ট, ও অ্যাভেইলেবিটির চক্করে নিজেকে জড়িয়ে ফেললে হয়ত তা উত্তম ফলাফলই বয়ে আনবে।
১০. পবিত্র ক্বুর’আনে মু’মিনদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এটি রাখা হয়েছে যে, তারা ‘লাগওয়া’ থেকে দূরে থাকে (২৩:৩)। আমি চারটি বাংলা অনুবাদ ও চারটি ইংরেজি অনুবাদে শব্দটির যে অর্থ পেলাম তাহলো- অসার কথাবার্তা, অসার ক্রিয়া-কলাপ, অনর্থক কথাকর্ম, অসার কর্মকান্ড, idle talk, vain things, vain talk, anything nonsensical, meaningless and vain (ফুটনোটে এসেছে)।
এ-ই কিন্তু বেঞ্চমার্ক। অতএব, হবি নির্বাচন, পর্যালোচনা, ও তৈরির সময়ে ক্বুর’আনের এই আয়াহ যেন দিক নির্দেশক থাকে আমাদের।